সংখ্যার রাজ্য (K1ngd0m 0f Num63r) - পার্ট ১
সংখ্যা কি? সংখ্যা হলো এক ধরনের চিহ্ন বিশেষ যা কোনো কিছুর পরিমাণ নির্দেশ করে এবং যা গণনার কাজে ব্যবহৃত হয়। বিভিন্ন ধরনের প্রতীক ব্যবহার করে সংখ্যা প্রকাশের বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে। যেমনঃ দশমিক(decimal) সংখ্যা ব্যবস্থা, দ্বিমিক(binary) সংখ্যা ব্যবস্থা, অষ্টক(octal) সংখ্যা ব্যবস্থা ইত্যাদি। ‘দশ’ সংখ্যাটি বোঝাতে রোমানরা ‘X’ প্রতীকটি ব্যবহার করতো, বাংলা ভাষায় একে ‘১০’ এবং ইংরেজিতে ‘10’ দ্বারা প্রকাশ করা হয়। আবার ‘10’ প্রতীকটি দ্বারা বাইনারী সংখ্যা ব্যবস্থায় এর মান বোঝায় 2(দুই); সংখ্যার বিভিন্ন ধর্ম এবং তাদের মধ্যেকার সম্পর্ক খুজতে গিয়েই সংখ্যাতত্ত্বের উদ্ভব। সর্বপ্রথম সংখ্যাতত্ত্বের ধারণা দিয়েছিলেন পিথাগোরাস। সংখ্যার রয়েছে হরেক রকমের বৈচিত্র্যময় বৈশিষ্ট্য। সংখ্যার এই বৈচিত্র্য নিয়েই আজ বলছি তোমাদের।
Abundant number:
Abundant শব্দের আভিধানিক অর্থ প্রচুর বা অঢেল। Abundant number এর বাংলায় একটা অদ্ভূত নাম আছে ‘পুষ্ট সংখ্যা’; যদি কোন সংখ্যার সকল প্রকৃত উৎপাদকের সমষ্টি উক্ত সংখ্যা অপেক্ষা বৃহত্তর হয়, তবে তাকে Abundant number বলে। যেমনঃ ১২ এর প্রকৃত উৎপাদকগুলো হচ্ছে ১, ২, ৩, ৪, এবং ৬; প্রকৃত উৎপাদকগুলোর সমষ্টি হচ্ছে ১+২+৩+৪+৬=১৬ যা ১২ অপেক্ষা বড়; অতএব, ১২ একটি Abundant number।
প্রথম দশটি Abundant number হচ্ছে 12, 18, 20, 24, 30, 36, 40, 42, 48, 54. সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম বিজোড় Abundant number হচ্ছে ৯৪৫; তোমাদের কাছে এখন আমার ছোট্ট একটা প্রশ্নঃ ১১তম Abundant number টি কত?
Deficient Number (অপুষ্ট সংখ্যা):
Deficient শব্দের আভিধানিক অর্থ খাটো। যদি কোন সংখ্যার সকল প্রকৃত উৎপাদকের সমষ্টি উক্ত সংখ্যা অপেক্ষা ক্ষুদ্রতর হয়, তবে তাকে Deficient number বলে। যেমনঃ ১৫ এর প্রকৃত উৎপাদকগুলো হচ্ছে ১, ৩ এবং ৫; প্রকৃত উৎপাদকগুলোর সমষ্টি হচ্ছে ১+৩+৫=৯ যা ১৫ অপেক্ষা ক্ষুদ্রতর; অতএব, ১৫ একটি Deficient number।
Perfect Number (নিখুঁত সংখ্যা বা শিষ্ট সংখ্যা):
যদি কোন সংখ্যার সকল প্রকৃত উৎপাদকের সমষ্টি উক্ত সংখ্যার সমান হয়, তবে তাকে Perfect number বলে। যেমনঃ ৬ এর উৎপাদকগুলো হচ্ছে ১,২,৩,৬; এদের মধ্যে প্রকৃত উৎপাদক হচ্ছে ১,২,৩; এখন, ১+২+৩=৬; তাই ৬ একটি নিখুঁত সংখ্যা। অনুরূপভাবে, ২৮ হচ্ছে পরবর্তী নিখুঁত সংখ্যা। ২৮-এর উৎপাদকগুলো হচ্ছে ১,২,৪,৭,১৪,২৮; এদের মধ্যে প্রকৃত উৎপাদকগুলো হচ্ছে ১,২,৪,৭,১৪; এখন, ১+২+৪+৭+১৪=২৮;
Sublime Number (মহিমান্বিত সংখ্যা):
কোন একটি পূর্ণ সংখ্যার উৎপাদক সংখ্যা যদি নিখুঁত সংখ্যার সমান হয়, তাকে Sublime Number বলে। যেমনঃ ১২ হছে একটি Sublime Number কারণ ১২-এর উৎপাদক সংখ্যা হচ্ছে ৬টি: ১, ২, ৩, ৪, ৬, ১২; আর আমরা জানি ৬ একটি নিখুঁত সংখ্যা।
Smith Number:
যে সংখ্যার অংকগুলোর যোগফল সংখ্যাটির মৌলিক উৎপাদকগুলোয় থাকা অংকগুলোর যোগফলের সমান, তাদের স্মিথ সংখ্যা বলে। যেমনঃ ৩৭৮ সংখ্যাটির অংকগুলোর (৩+৭+৮) যোগফল ১৮; আবার, ৩৭৮=২X৩X৩X৩X৭; ৩৭৮ এর মৌলিক উৎপাদকগুলোর অংকগুলোর (২+৩+৩+৩+৭) যোগফল ১৮; তাই ৩৭৮ একটি স্মিথ সংখ্যা।
আবার ৬৬৬ একটি স্মিথ সংখ্যা। ৬৬৬ সংখ্যাটির অংকগুলোর (৬+৬+৬) যোগফল ১৮; ৬৬৬=২X৩X৩X৩৭; ৬৬৬ এর মৌলিক উৎপাদকগুলোর অংকগুলোর (২+৩+৩+৩+৭) যোগফলও ১৮;
এখানে লক্ষণীয় যে, উৎপাদকগুলোর মধ্যে দুই অংক বিশিষ্ট সংখ্যা থাকলে তাদের অনুরূপ আলাদা অংক হিসেবে যোগ করতে হবে।
লেহাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আলবার্ট উইলানস্কি এ ধরণের সংখ্যার নামকরণ করেন। তিনি তার শ্যালক হ্যারল্ড স্মিথের ফোন নাম্বার থেকে এ সংখ্যার ধারণা পান। হ্যারল্ড স্মিথের ফোন নাম্বার ছিলো ৪৯৩-৭৭৭৫; ৪৯৩৭৭৭৫=৩X৫x৫X৬৫৮৩৭; ৩+৫+৫+৬+৫+৮+৩+৭ = ৪২ = ৪+৯+৩+৭+৭+৭+৫;
Niven Number (হর্ষদ সংখ্যা):
সংস্কৃত ভাষায় হর্ষদ মানে হচ্ছে যে আনন্দ দেয়। যখন কোনো ধনাত্মক পূর্ণ সংখ্যা তার অংকসমূহের যোগফল দ্বারা নিঃশেষে বিভাজ্য হয়, তখন তাকে হর্ষদ সংখ্যা বলে। যেমনঃ ১৯২ একটি হর্ষদ সংখ্যা। কারণ, ১+৯+২=১২; ১৯২ সংখ্যাটি ১২ দ্বারা নিঃশেষে বিভাজ্য। ১৯২/১২=১৬; আরো কিছু হর্ষদ সংখ্যার উদাহরণঃ ৭০, ৮১, ১০০, ১০৮, ১১২, ২০৯; এবার তোমরা বলো ১৪২৮৫৭ কি একটি হর্ষদ সংখ্যা?
১৯৫৫ সালে ভারতীয় গণিতবিদ ডি আর ক্যাপ্রেকার সর্বপ্রথম এই ধরনের সংখ্যার সংজ্ঞা দেন। এ ধরনের মজার সংখ্যাকে কানাডিয়ান গণিতজ্ঞ ইভান এম নিভেন-এর নামানুসারে Niven Number-ও বলা হয়।
Amenable number:
Amenable শব্দের আভিধানিক অর্থ বাধ্য বা অনুগত। এক সেট সংখ্যার যোগফল এবং গুণফল যদি একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা হয় তবে এ ধরনের সংখ্যাকে Amenable number বলে। সাধারণভাবে লিখলে, কোনো সংখ্যা n কে যদি এক সেট সংখ্যা {a1, a2, a3, … an} দ্বারা এমনভাবে প্রকাশ করা যায় যেন, n = হয় তবে n একটি Amenable number হবে। যেমনঃ 5 একটি Amenable number. কারণ 5 = 1+(-1)+1+(-1)+5 = 1*(-1)*1*(-1)*5;
Amicable Number বা Friendship Number:
Amicable শব্দের আভিধানিক অর্থ সৌহার্দ্যপূর্ণ বা বন্ধুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ Amicable Number কে বলা যেতে পারে সুহৃদ বা বন্ধু সংখ্যা। দু’টি সংখ্যার প্রথমটির সকল প্রকৃত উৎপাদকসমূহের যোগফল যদি দ্বিতীয় সংখ্যাটির সমান হয় এবং দ্বিতীয়টির সকল প্রকৃত উৎপাদকসমূহের যোগফল যদি প্রথম সংখ্যাটির সমান হয় তবে এ সংখ্যা দু’টিকে বন্ধু সংখ্যা বলা হয়।
যেমনঃ ২২০ এর প্রকৃত উৎপাদকগুলো হলো {১, ২, ৪, ৫, ১০, ১১, ২০, ২২, ৪৪, ৫৫, ১১০} এবং এদের সমষ্টি ১+২+৪+৫+১০+১১+২০+২২+৪৪+৫৫+১১০=২৮৪;
অপরদিকে, ২৮৪ এর প্রকৃত উৎপাদকগুলো হলো {১, ২, ৪, ৭১, ১৪২} এবং এদের সমষ্টি ১+২+৪+৭১+১৪২=২২০; তাই ২২০ ও ২৮৪ এই দু’টি সংখ্যাকে amicable pair বলা হয়।
আরো কিছু amicable pair এর উদাহরণঃ (১১৮৪,১২১০), (২৬২০,২৯২৪), (৫০২০,৫৫৬৪)।
Automorphic বা Circular Number:
কোন একটি সংখ্যাকে বর্গ করলে যদি বর্গসংখ্যার শেষে উক্ত সংখ্যাটি দৃশ্যমান হয়, তবে সেই সংখ্যাটিকে বৃত্তীয় সংখ্যা বলে। যেমনঃ ১, ৫, ৬, ২৫, ৭৬, ৩৭৬, ৬২৫ এগুলো বৃত্তীয় সংখ্যা। কারণ, ৫^২ = ২৫; ৬^২ = ৩৬; ২৫^২ = ৬২৫; ৭৬^২ = ৫৭৭৬;
Trimorphic Number:
কোন একটি সংখ্যাকে কিউব (ঘন) করলে যদি ঘনসংখ্যার শেষে উক্ত সংখ্যাটি দৃশ্যমান হয়, তবে সেই সংখ্যাটিকে Trimorphic Number বলে। যেমনঃ ১, ৪, ৫, ৬, ৯, ২৪, ২৫, ৪৯, ৫১, ৫১, ৭৫, ৭৬, ৯৯, ১২৫, ২৪৯, ২৫১, ৩৭৫, ৩৭৬, ৪৯৯, ৫০১, ৬২৪, ৬২৫, ৭৪৯, ৭৫১, ৮৭৫, ৯৯৯ ইত্যাদি এগুলো Trimorphic Number. ১^৩=১; ৪^৩=৬৪; ৫^৩=১২৫; ৬^৩=২১৬;
Trimorphic number খুঁজে বের করার সহজ কোনো সূত্র না থাকলেও, তবে কিছু কিছু trimorphic number খুব সহজেই লিখে ফেলা যায়। এই ধরনের trimorphic number লেখার জন্য তোমাদেরকে কোনো চিন্তা ভাবনা করার কোনো দরকার পরবে না, শুধু লিখে ফেললেই হবে। যেমনঃ ৯, ৯৯, ৯৯৯, ৯৯৯৯, ৯৯৯৯৯, ৯৯৯৯৯৯৯, ৯৯৯৯৯৯৯৯৯ ইত্যাদি। আরো আছে – ৪৯, ৪৯৯, ৪৯৯৯, ৪৯৯৯৯, ৪৯৯৯৯৯, ৪৯৯৯৯৯৯, ৪৯৯৯৯৯৯৯৯ ইত্যাদি। তাছাড়া – ৫১, ৫০১, ৫০০১, ৫০০০১, ৫০০০০০১, ৫০০০০০০১, ৫০০০০০০০১ ইত্যাদি।
Cardinal Number (অংকবাচক বা পরিমাণবাচক সংখ্যা):
যে সকল সংখ্যা কেবল পরিমাণ নির্দেশ করে কিন্তু অবস্থান বা ক্রম নির্দেশ করে না তাদেরকে পরিমাণবাচক সংখ্যা বলে। যেমনঃ একটি ঝুড়িতে ৩০টি আপেল আছে। এখানে ৩০ সংখ্যাটি একটি পরিমাণবাচক সংখ্যা। কারণ এখানে ৩০ সংখ্যাটি দ্বারা আপেলের পরিমাণ বোঝানো হয়েছে।
Ordinal Number (ক্রমবাচক বা পূরণবাচক সংখ্যা):
কোনো নির্দিষ্ট সেটের সংখ্যাগুলো যদি এর ক্রমকে বিবেচনা করে সুনির্দিষ্ট হয় তবে তাকে ক্রমবাচক সংখ্যা বলে। ক্রমবাচক সংখ্যায় সংখ্যাটির পরিমাণের কোনো গুরুত্ব থাকে না। যেমনঃ ফোন নাম্বার, বাড়ি, গাড়ি বা অন্য যে কোন বস্তুর লাইসেন্স নাম্বার ইত্যাদি সংখ্যাগুলো ক্রমবাচক সংখ্যা। ধরা যাক, ৫৩৪ ও ৬৬৮ সংখ্যা দু’টি দুইটি গাড়ির লাইসেন্স নাম্বার। এই সংখ্যা দু’টি দ্বারা কেবল ক্রম নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এখানে প্রদত্ত সংখ্যা দু’টির পরিমাণ গুরুত্বহীন। তাই এই সংখ্যা দুইটি ক্রমবাচক।
Class frequency (শ্রেণি গণসংখ্যা):
কোনো শ্রেণির যে সংখ্যক ঘটনসংখ্যা বিদ্যমান তাই উক্ত শ্রেণির গণসংখ্যা। ব্যাপারটা একটু ব্যাখ্যা করা যাক।
উপরের টেবিল থেকে দেখা যাচ্ছে, ১০ জন ছাত্র ৮০-১০০ এর মধ্যে নাম্বার পেয়েছে। কথাটা এভাবেও বলা যেতে পারে A+ পেয়েছে কতজন? ১০ জন। অর্থাৎ এখানে ঘটনাসংখ্যা ১০।
আবার ৭০ থেকে ৭৯ বা A পেয়েছে কতজন? ৯ জন। অর্থাৎ এখানে ঘটনসংখ্যা ৯।
Complex/Imaginary Number (জটিল বা কাল্পনিক সংখ্যা):
z=a+ib আকারের যে কোন সংখ্যাকে জটিল সংখ্যা বলে। যেখানে a ও b বাস্তব সংখ্যা এবং i =. একটি জটিল রাশির দু’টি অংশ থাকে। বাস্তব অংশ(real part) ও কাল্পনিক অংশ(imaginary part) এবং এদেরকে যথাক্রমে Re(z) ও Im(z) দ্বারা প্রকাশ করা হয়। z=a+ib এর জন্য Re(z)=a এবং Im(z)=b.
![]() |
চিত্রঃ (০১) গ্রাফের মাধ্যমে জটিল সংখ্যার প্রকাশ |
ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ইতালিয়ান গণিতবিদ Gerolamo Cardano সর্বপ্রথম দেখান যে, কোনো বাস্তব সংখ্যাকে ঋণাত্মক সংখ্যার গুণ আকারে প্রকাশ করা যায়। তিনি প্রথম 40 কে (5+(15)^(1/2)) এবং (5-(-15)^(1/2)) এর গুণফল আকারে প্রকাশ করে জটিল সংখ্যার ধারণা দেন। পররর্তীতে সুইস গণিতবিদ অয়েলার, জটিল রাশি প্রকাশে i এর ধারণা দেন।
Conjugate Complex Number (অনুবন্ধি জটিল রাশি):
কোনো জটিল রাশির i কে -i দ্বারা প্রতিস্থাপন করলে যে জটিল রাশি পাওয়া যায় তাকে পূর্বোক্ত জটিল রাশির অনুবন্ধি জটিল রাশি বলা হয়। যেমনঃ (a+ib) এর অনুবন্ধি জটিল রাশি (a-ib)। এই দু’টি জটিল রাশিকে একত্রে অনুবন্ধি যুগল বলে।
আরও অনেক সংখ্যা আছে যা আজকে আলোচনা করা সম্ভব হল না। পরের পার্টে আমরা বাকি সংখ্যা নিয়ে জানবো।
তথ্যসুত্রঃ
- en.wikipedia.org
- প্রথম আলো গণিত ইসকুল
- গণিতকোষ-সফিক ইসলাম
- প্রকাশসত্ত্বঃ পাই-জিরো টু ইনফিনিটি, ডিসেম্বর'১৩ সংখ্যা।


Comments
Post a Comment